• বৃহস্পতিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৭, ৯ ভাদ্র ১৪২৪
  • ||
  • আর্কাইভ

বৃষ্টি-বাদলে ফুলিদের কষ্ট

প্রকাশ:  ১২ আগস্ট ২০১৭, ২০:৪৫
ইসমত মর্জিদা ইতি, চট্টগ্রাম
প্রিন্ট

‘ফুলি ওই ফুলি, বিষ্টির মইধ্যে ভিজিসনা কইলাম, তোর বাপের লগে পলিথিনডা ধইরা রশি দিয়া গিট্টু দে।’

পুরাতন ষ্টেশনের পাশে বটতলী মোড়ে রাস্তার উপরে পলিথিনের ছাউনি মুড়িয়ে ফুলিরা যেখানে থাকেন, বৃষ্টিতে সে পলিথিন উড়ে গেছে। তাই বৃষ্টিতে ভিজেই পলিথিন নিয়ে ছাউনি দিয়ে বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার তোড়জোড় পড়ে যায়। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে পলিথিন উড়ে যাওয়ায় বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা পায়না ফুলি, তার মা আর ছোট ভাইবোনেরা। 

শনিবার সকালে বৃষ্টির সময় এ পথ দিয়ে যাওয়ার সময় চোখে পড়লো, সিদ্দিক মিয়াও নছিমন বেগম, নাদের হোসেনের পলিথিন লাগানোর ব্যস্ততা। সিদ্দিক মিয়া বলেন,  ‘বাজানগো রাস্তাঘাটে পান সিগারেট বেইচ্যা চলি। থাকার জায়গা নাই। পরিবার, পোলা ও বোনডারে লইয়া এখানে থাহি। অহন পলিথিনডা না লাগাইতে না পারলে ক্ষেতা (কাঁথা) বালিশ সব ভিইজ্যা যাইবো।’

হোসনে আরা বেগম। বৃষ্টি নামার আগেই তার পলিথিনের ঘরে ঢুকে পড়েন। তার বড় ভাই হোসেন মিয়ার সঙ্গে কথা বলার এক পর্যায়ে মুষলধারে বৃষ্টি নামলে হোসনে আরা ঘর থেকে মাথা বের করে বলেন, ‘বৃষ্টির মইধ্যে ভিজতাছেন ক্যারে, এই গরিবের ছাউনিতে আইয়া বইন। বোঝা গেরেঅ, বৃষ্টির তোড়ে পলিথিনটা বেশীক্ষণ বৃষ্টিকে বাগিয়ে রাখতে পারবে না।’ 

শুধু ফুলি, হোসনে আরা, সিদ্দিক মিয়াই নয়, শ্রাবণের বৃষ্টিতে নগরীর ভাসমান এরকম অসংখ্য মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বৃষ্টিতে ভিজে নিজে জুবুথুবু হয়ে ভাসমান পানিবেষ্টিত ঘরের মধ্যে বসে থাকতে হচ্ছে অনেককে। ভাসমান এসব মানুষদের অনেকেই পুরাতন রেলষ্টেশন, বিভিন্ন বস্তি কিংবা ব্রীজের নীচে থাকেন। কিন্তু বৃষ্টির মধ্যে সে ভাসমান থাকার যে জায়গাটা, তার উপরে বাঁশের খুঁটি লাগিয়ে পলিথিন দিয়ে ঘর বানায় তারা। তার ভিতরেই রাখে নিজেদের বিছানা, বালিস, হাড়ি-পাতিল। কিন্তু বৃষ্টির প্রবল তোড়ে পলিথিন উড়ে যায় কিংবা ফুটো হয়ে পানি পড়ে সব ভাসিয়ে  নিয়ে যায় এসব ভাসমান মানুষদের। 

শ্রাবণের আগেই আষাঢ় মাসেও প্রবল বৃষ্টির তোড়েও এসব ভাসমান মানুষদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। বস্তির চালা দিয়ে পানি পড়ে ঘরের সব জিনিস ভিজে গেছে একইরকম অভিযোগ শোনা গেলো দেওয়ানহাট বস্তিতে গিয়ে। অনেকেই জানান, পলিথিনের চড়া দামেও সেটি কিনতেও পারছেন না অনেকে। 

নুরুল মিয়া জানান, দুই ছেলেমেয়ে, স্ত্রী নিয়ে দেওয়ানহাট বস্তিতে থাকেন চার বছর ধরে। প্রতি বর্ষার আগে পলিথিন, বাঁশ দিয়ে ছাউনিটা মেরামত করলেও বর্ষায় এ ছাউনি ভেদ করে বৃষ্টির পানিতে ঘর ভিজে যায়। আর রাস্তার পানি বস্তির খুপড়ি ঘরে এসে জমা হয়ে যায়। সারারাত সেই পানির মধ্যে বউ-বাচ্চা নিয়ে বসে থাকি। গরীব ভাতেও মরে, বৃষ্টিতে মরে, আক্ষেপ করে বলেন নুরুল মিয়া।

এছাড়ও স্বল্প আয়ের লোকেরা যারা দুই থেকে আড়াই হাজার টাকার সেমিপাকা ঘরে ভাড়া থাকেন, তাদের ঘরগুলো বর্ষায় বাড়ির মালিকেরা মেরামত করার তাগাদা অনুভব করেন না। মিস্ত্রিপাড়ার ওসমান আলীর বস্তির ভাড়াঘরের অবস্থা প্রায় সেসরকমই। হাসনা নামে এক বস্তিবাসী জানান, দেড়হাজার টাকা ঘর ভাড়া দেই। মাথার উপরে টিনের চালটা ফুটো। জমিদারকে বলার পরও ঘরটা মেরামত করেনি। রাতে বৃষ্টি এলে ঘরের সব জায়গায় বাটি, গামলা দিয়ে রাখি। রাতে ঘুমাবো কি, গামলার পানি ফেলতেই রাত শেষ হয়ে যায়।