• বৃহস্পতিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৭, ৯ ভাদ্র ১৪২৪
  • ||
  • আর্কাইভ

কন্ঠশিল্পী আব্দুল জব্বার রাজনীতির শিকার!

প্রকাশ:  ১২ আগস্ট ২০১৭, ১২:০২ | আপডেট : ১২ আগস্ট ২০১৭, ১২:০৯
সোহেল সানি ও রাজিয়া সুলতানা
প্রিন্ট

রাজনীতির ন্যায় সংস্কৃতিতেও তীক্ষ্ণ বুদ্ধির মোহনীয় ব্যক্তিত্ব সবাই হতে পারেন না। ঈশ্বরীয় প্রতিভা ও শিক্ষার মিশেলে কেউ কেউ ইতিহাসে স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় সূচিত করেন। সংস্কৃতিতে তেমনি এক মোহিনীশক্তি কন্ঠশিল্পী আব্দুল জব্বার। 

জীবন-মৃত্যুর সম্মুখ-সঙ্কট যুদ্ধে অবতীর্ণ এই বিদগ্ধ শিল্পী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে শয্যাশায়ী বর্ষীয়ান এ কন্ঠশিল্পীকে নিয়ে বিভিন্ন মহলে চলছে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া। উঠেছে নানা প্রশ্ন। যার অনেকটা মনগড়া। মানুষের দেহ-মনে বেদনা থাকলে বেদনার নিরাময় স্বাভাবিকভাবে তার কাম্য। 

হয়ত বঙ্গবন্ধু হত্যার পর প্রতিকূল পরিবেশে ছোটখাটো ভুল করেছেন তিনি। অনেক সত্যকে উপেক্ষা করেছেন। হয়ত বুঝতে চাননি যে চন্দ্রগ্রহণ বা সূর্যগ্রহণের মতো যে সত্যকে সাময়িকভাবে নানা আবরণে ঢেকে রাখা গেলেও চন্দ্র-সূর্যের মতো সত্য তার নিজস্ব মহিমায় প্রতিভাত হবেই। বঙ্গবন্ধু যেমন। তাঁর  হত্যার পর  অনেকেরই মনুষ্যত্ব ও অস্তিত্ব লোপ পেয়েছিলো। 

যারা অসত্যের আশ্রয় নেয়, যারা সত্যকে গোপন করে বা বিতাড়িত করার কার্যে লিপ্ত হয়, জীবনের একটা পর্যায়ে নাজেহাল হওয়া যেন তাদের ভাগ্যলিপি। আব্দুল জব্বারকে সেই ভাগ্যলিপি পেয়ে বসেছে? জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু'র পুত্রতুল্য শিল্পী হওয়া সত্ত্বেও আব্দুল জব্বারের চিকিৎসার প্রতি এ জন্যই কি সরকারের কৃপণতা? উদারতার বদলে উদাসিনীতা? অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে অতীতের কতিপয় ঘটনা। 

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর "প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ" গানের শিল্পী আপেল মাহমুদের শিকার হন আব্দুল জব্বার। জিয়াউর রহমানের সান্নিধ্যলাভ করেন আপেল মাহমুদের হাত ধরে। '৮০-তে একুশে পদকলাভ করেন সে সুবাদে। সেই সূত্রে '৯৬ সালেও খালেদা জিয়ার শাসনামলে পান স্বাধীনতা পুরস্কার। তারেক রহমান আব্দুল জব্বারের অসচ্ছলতার কথা জেনে ৫ লাখ দিয়েছিলেন। 

কথিত যে, কৃতঋণ হিসাবে আব্দুল জব্বার তারেক রহমানের পদধুলি নেন। অবশ্য এটা আব্দুল জব্বার অস্বীকার করেছেন। তারপরও কথা থাকে মোশতাকের মন্ত্রীত্ব নিয়েও যদি ক্ষমা পাওয়া যায়, তাহলে আব্দুল জব্বার নয় কোন? সত্যের প্রতি মানুষের ব্যভিচারমমূলক আচরণ লক্ষ করে যীশুখৃষ্টের একটি অমোঘ বানী উদ্ধৃত করতে হয়ঃ 

Forgive them Lord, they do not know what they are doing" ("প্রভু ওদেরে ক্ষমা করো, ওরা জানে না, ওরা কি করেছে") প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আব্দুল জব্বারকে ২০ লাখ টাকা দিয়েছেন। স্বাস্থ্যমমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের বন্ধু সেই সূত্রে কেবিন ভাড়া মওকুফ করে দেওয়া হয়েছে। 

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দেখতে গিয়ে কথা দিয়ে এসেছেন আর্থিক সহায়তার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন। কিন্তু ২০ লাখ টাকা যথেষ্ট নয় বললেও সরকার আর সাড়া দিচ্ছে না। অথচ, মুক্তিযোদ্ধা শিল্পী হিসাবে সাড়া পাওয়া উচিৎ। 

এ প্রসঙ্গে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কথা উল্লেখ করতে হয়। তিনি কতো বিশাল হ্নদয়ের অধিকারী ছিলেন তা বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী পড়লে আঁচ করা যায়। '৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে করাচীর এক সাংবাদিক গিয়েছিল তার সঙ্গে সাক্ষাত করতে। সাংবাদিক জানায়, তার বসতবাড়ি নিয়ে একটা মামলা চলছে। সে ব্যাপারে সাহায্যের জন্য এসেছেন। 

সোহরাওয়ার্দী বলেন, একজন প্রধানমন্ত্রী কোর্টে দাঁড়াতে পারেন কি করে? সাংবাদিক এমন কথা শুনে বলেন, আমি তো টাকার অভাবে মামলার উকিল নিয়োগ দিতে পারছিনা। সোহরাওয়ার্দী তাঁর দেরাজ খুলে দুই হাজার টাকা সাংবাদিকের হাতে গুজে দেন। উপস্থিত শেখ মুজিবুর রহমান, জহিরুদ্দীন ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এ দৃশ্য দেখতে ছিলেন। 

সাংবাদিকটি চলে যাওয়ার পর অনেকটা রাগস্বরে একসুরে তিন নেতা বলেন, লিডার, এই সাংবাদিক আপনার বিরুদ্ধে ক'দিন আগেও লিখেছে। আর তাকে টাকা দিয়ে দিলেন? সোহরাওয়ার্দী গম্ভীর কন্ঠে বলেন, ও আমার বিরুদ্ধে লিখেছে, প্রধানমন্ত্রী হিসাবে পেপার ক্লিপিং এটা আমি পড়েছি।

ও তাও জানে। শোনো, এটা জেনেও যখন আমার কাছে এসেছে তখন বুঝতে হবে, তার বিপদে আল্লাহর পর এই পৃথিবীতে তাকে সাহায্য করার আমি ছাড়া আর কেউ নেই।"আব্দুল জব্বারও এক সময় চলে যাবেন কিন্তু তার সঙ্গীতশক্তির প্রেরণা অক্ষুন্ন থাকবে। থাকবে সজীব, সরব ও সজাগ এবং প্রবল প্রখরভাবে কীর্তি বেঁচে থাকবে। 

তিনি সঙ্গীতে যে দৃষ্টান্ত রেখেছেন তাও অম্লান থাকবে। এ কারণেই সরকার তথা দেশবাসী শোকবিধুর হবার আগে তার আপন বিশ্বাসের প্রতি সমীহ দেখাতে পারি। যেহেতু তিনি এখনও বলছেন "মারা যাওয়ার পর শহীদ মিনারে আমার মরদেহে যারা ফুল দিতে যাবেন, তারা বেঁচে থাকার জন্য আমাকে সাহায্য করুন। 

যারা আমার লাইফ সাপোর্টে থাকার কথা শুনে হাসপাতালে ভিড় করবেন, তারা আগে আমাকে বাঁচাতে সাহায্য করুন।" আব্দুল জব্বার সঙ্গীতময় কর্মজীবনের কীর্তিময়তার মধ্যাহ্ন গগনের সূর্যের মতো প্রদীপ্ত আলোক বিকিরণ করেছেন। 

সুচিকিৎসা সংকটে মৃত্যুর নির্দয় হস্ত তাঁর জলদগম্ভীর কন্ঠকে স্তদ্ধ করুক তা দেশবাসীও চায় না। একটি সম্ভাবনা ও প্রতিশ্রুতির অমিত উৎস অকস্মাৎ নিঃশেষিত হয়ে যাবে, তা কারো কাম্য হতে পারে না। তার মতো এখনও সজাগ জীবাণুভূতিতে স্পন্দিত শিল্পী সহজে চোখে পড়ে না। 

একাত্তরের রণাঙ্গনে দেশ ও জনগণের সঙ্গে সম্পর্কিত তার সামান্যতা স্পন্দনও অনুভব শক্তিকে এড়িয়ে প্রখর দৃষ্টিকে পাশ কাটাতে পারেনি। সঙ্গীতে তার সর্বাত্মক নিবিষ্টতা চলমান জীবনের প্রতিটি স্পন্দনের সঙ্গে তার সম্পর্কের প্রবল  গভীরতা এবং সজাগ সতর্ক প্রতিক্রিয়ার সার্বক্ষণিক প্রখরতা তাকে বাঁচিয়ে তুলতে পারে। এটা তার নিষ্ঠুর সময়। 

যেন মুহুর্মুহু সঙ্গীতের স্নায়ুর ওপর বিরূপ আঘাত হানছে। আব্দুল জব্বারের  চাওয়া-পাওয়া, শ্রদ্ধা-ভক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে পরিবারের মধ্যে। সে কারণে একটা ইতিহাস পাঠের কথা মনে পড়ছে। ১৮৩২-এর মালভূমে গঙ্গানারায়ণের ভূমিজ নামক গোত্রের আন্দোলন ইংরেজ শাসনকে ঝাঁকা দেয়। নিম্নশ্রেণীর ভূমিজ গোষ্ঠী সম্পর্কে কিংবদন্তি আছে 'ভূমি ফুঁড়ে কিছু মানুষ গো-দেবতাকে রক্ষা করেছিলো। 

তাই তারা দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে জীবন বাজী রাখাকে জীবনেরই অবলম্বন বলে বেছে নিয়েছিলো। আব্দুল জব্বার শিল্পী শ্রেণীর লোক। বিখ্যাত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কন্ঠ শিল্পী হিসাবে। তার প্রতি ভুমিজ নিম্নশ্রেণী নয় সবশ্রেণীরই ভক্তি শ্রদ্ধা রয়েছে। তার জলদগম্ভীর কন্ঠ জীবনের গান গায় বলে। অকুন্ঠ ভক্তি তার প্রাপ্য। সম্প্রতি আলাপচারীতা হয় শয্যাশায়ী আব্দুল জব্বারের সঙ্গে। 

তার আবেগময় কিছু চাওয়া-পাওয়াকে সামনে রেখে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় দেশের স্বনামখ্যাত অন্তত দশটি অনলাইনসহ একাধিক দৈনিকে। ভক্তিরসে প্রদীপ্ত প্রতিবেদনটি প্রকাশের ক'দিন পর কন্ঠশিল্পী জব্বারের স্ত্রী শাহীন জব্বার মুখ খুলেন। আড়চোখা বক্তব্য লক্ষ করা যায় তার কন্ঠে। 

অভিযোগ করে বলেন, 'একটি বিশেষ মহল তার স্বামীকে ভিক্ষুক বানানোর চক্রান্ত করছে। দেশবাসীর কাছে এক টাকা করে চাওয়ার খবরটি ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। শয্যাশায়ী শিল্পীর সঙ্গে কথোপকথনকালে জব্বারের স্ত্রী শাহীন জব্বার ছিলেন না। ছিলেন আরেক স্ত্রী। সঙ্গে এক পুত্র। তার চিকিৎসা খরচ মেটানো হচ্ছে মানুষের টাকা দিয়েই। একবারে 'টপ টু বটম' বললেও ভুল হবে না। 

ইতিপূর্বে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০ লাখ টাকা দিয়েছেন। পাঁচ লাখ থেকে শুরু করে বিভিন্ন অংকের টাকা বিত্তশালীরা দিয়েছেন। দেশবাসী সাধারণ। তাই এক টাকা তার স্বামী নেন কি করে? শাহীন জব্বারের প্রশ্ন। হয়ত এ যুগে এক টাকার মূল্য নেই। এটা শেখ হাসিনার আমল, শায়েস্তা খাঁর আমল নয় যে, এক টাকায় আট মন চাল পাওয়া যাবে। গুণতিতে অবশ্য সাধারণের এক টাকা করে মানে ষোল কোটি টাকা। যা জব্বারের চিকিৎসা ব্যয়ের ষোলগুণ বেশী। 

পাঠকরা ম্যাসেঞ্জারে জানতে চেয়েছেন, তারা টাকা কিভাবে দেবেন, কোথায় দেবেন, কার কাছে দেবেন? দারুণ কৌতহল। জব্বারের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তিকে যা ম্লান করে না। আব্দুল জব্বারের এক টাকা করে দাবী করাটাকে অনেকটা রূপক অর্থে বিবেচনা করা যায়। শব্দতত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার প্রকাশ মিলেছে আব্দুল জব্বারের এক টাকা করে দাবীর মর্মার্থে। জব্বার একজন কন্ঠশিল্পী। 

সঙ্গীতাকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র। কোনভাবে দেবতুল্য নন। সাধারণ মানুষ যার যা আছে সে দিয়ে দেবতাকে মূর্তিরূপ দিয়ে পুজা করে।পয়সা ছুঁড়ে দেয়। মুসলমানদের পবিত্রতম জুম্মার দিনে মসজিদে মসজিদে নামাজীদের কাছ থেকে (আল্লাহর ঘরের জন্য) কাপড় মেলে ধরে ধরে অর্থ তোলে। সেখানে শুধু টাকার নোট নয়, পয়সাও পড়ে। তাতে কি আল্লাহর সন্তুষ্টির সংকট দেখা দেয়? প্রধানমন্ত্রী যে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে শিল্পীকে ২০ লাখ দিয়েছেন তাও সাধারণের ট্যাক্মের পয়সা।