• সোমবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৯ আশ্বিন ১৪২৪
  • ||
  • আর্কাইভ
শিরোনাম

শেখ হাসিনার চোখে জল

প্রকাশ:  ২৪ আগস্ট ২০১৭, ০৪:৩৩
শামীমুল হক
প্রিন্ট

অফিসে বসে রিপোর্ট লিখছি। হঠাৎ সংবাদ বঙ্গবন্ধু এভিনিউর জনসভায় গ্রেনেড হামলা হয়েছে। অনেক হতাহত হয়েছে। দ্রুত সেখানে যাওয়ার নির্দেশ। অফিস থেকে বেরিয়ে দেখি গাড়ির সংখ্যা কম। মানুষ ছুটছে সব উত্তর দিকে। গুলিস্তানের দিকে কোনো গাড়ি যাচ্ছে না। গাড়ির জন্য অপেক্ষা করলে দেরি হয়ে যাবে। আমি দৌড়াতে লাগলাম। গুলিস্তানে গিয়ে দেখি মানুষের হাহাকার। ইতিমধ্যে অনেককে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বিভিন্ন হাসপাতালে। কান্নার রোল চারদিকে। শুনলাম আইভি রহমান মারা গেছেন। সরজমিন দেখে অফিসে এসে রিপোর্ট লিখলাম। ২১শে আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার খবর। অফিসে এসে খবর পাই আইভি রহমানকে নেয়া হয়েছে সিএমএইচ-এ। তার অবস্থা গুরুতর। প্রতিদিনই আইভি রহমানের খবর নিতে গিয়ে জানতে পারি তার অবস্থার অবনতি। সংজ্ঞাহীন। দু’টি পা কেটে ফেলা হয়েছে। 

এ অবস্থায়ই ২৪শে আগস্ট রাতে খবর পাই আইভি রহমান আর নেই। ২৫শে আগস্ট সকালে অফিস থেকে ফোন- গুলশানে আইভি টাওয়ারে যেতে হবে। আইভি রহমানের লাশ সেখানে নেয়া হবে। যথারীতি সেখানে পৌঁছলাম। আইভি কনকর্ড টাওয়ারের পঞ্চম তলা। পূর্ব-উত্তর কোণের রুমে শোকে মুহ্যমান জিল্লুর রহমান বিছানায় শোয়া। স্ত্রী বেগম আইভি রহমানের লাশের অপেক্ষায় তিনি। ছেলে পাপন আর ২ কন্যা তানিয়া ও ময়নার গগনবিদারী আহাজারি। এ বাড়ি ঘিরে শোকার্ত মানুষের ঢল। সবার চোখে পানি। কাঁদছে গোটা দেশ। সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল থেকে লাশ আসবে। মিডিয়া কর্মীদের ভিড়। এ সময়ে জিল্লুর রহমান কি বলবেন? সাংবাদিকরা তার মুখ থেকে কিছু শুনতে চাইছেন। লাশ তখনও আসেনি। সুযোগ হলো জিল্লুর রহমানের সামনে যাওয়ার। রুমে প্রবেশ করেই দেখতে পেলাম অঝোরে কাঁদছেন তিনি। দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গীকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ। আনমনা হয়ে বিড়বিড় করছেন। কখনও চিৎকার করে কেঁদে উঠছেন। কিছুই বলতে পারছিলাম না। প্রাজ্ঞ, অভিজ্ঞ এই রাজনীতিবিদ বুঝতে পারছিলেন তার জীবনসঙ্গী সম্পর্কে কিছু জানতে চাই। তাই নিজ থেকেই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। বললেন, একা হয়ে গেলাম। বড় একা। যতদিন বেঁচে থাকবো আইভির স্মৃতি আমাকে তাড়া করে ফিরবে। ৪৬ বছরের সাংসারিক জীবনে আমাদের মাঝে কখনও ভুল  বোঝাবুঝি হয়নি। এ সময়ে কখনও একজন আরেকজন থেকে দূরে থাকিনি। ক্লাস নাইনে থাকতেই বিয়ে হয়। বিয়ের আগেই আইভিকে চিনতাম, তবে প্রেম ছিল না। 

সুদর্শনা আইভির সংগীত ও নৃত্যে মুগ্ধ হয়েই আকৃষ্ট হয়েছিলাম। দীর্ঘশ্বাস  ছেড়ে আবার বলতে থাকেন, যে বিশ্বাস নিয়ে আইভিকে ঘরে এনেছিলাম সে বিশ্বাস দীর্ঘ ৪৬ বছরে একবারের জন্যও নষ্ট হতে দেয়নি। বরং তার অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতার জন্যই এ পর্যন্ত আসতে পেরেছি। বৃদ্ধ বয়সে এসেও রাজনীতি করতে পারছি। মাত্র তিনদিন আগে ২১শে আগস্ট আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের জনসভায় একসঙ্গে গিয়েছিলেন জিল্লুর রহমান ও আইভি রহমান। কে জানতো এ যাওয়াই তাদের শেষ যাওয়া। ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমান মারাত্মক আহত হন। তার দু’টি পা-ই কেটে ফেলতে হয়। ভর্তি করা হয় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে। ২৪শে আগস্ট রাত ৩টায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আইভি রহমান। শোকাহত গোটা দেশ। গুলশান আইভি কনকর্ড টাওয়ারে শোকাহত মানুষের ভিড়। জিল্লুর রহমানের কথা- ২১শে আগস্ট জনসভায় যাওয়ার সময় আইভি নিজ হাতে পায়জামা-পাঞ্জাবি বের করে দেয়। পাঞ্জাবি পরার পর বলে, এটি খুলে ফেলো। লালচে লাগছে। ভালো সাদা পাঞ্জাবি পরে যাও। নিজ হাতেই অন্য একটি পাঞ্জাবি বের করে দেয়। এটি পরার পর বলে, দেখ কত সুন্দর লাগছে। কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন জিল্লুর রহমান। একটু পর আবার বলতে থাকেন, ও ছিল সুন্দরের পূজারী। সুন্দরকে মনেপ্রাণে ভালোবাসতো। জিল্লুর রহমানের প্রতিক্রিয়া নিয়ে বাইরে বেরুতেই খবর আসে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা আসছেন আইভিকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। 

শেষবারের মতো দেখতে। জিল্লুর রহমানের শোকাহত পরিবারকে সহমর্মিতা জানাতে। এবার অপেক্ষা তাদের জন্য। হঠাৎ পিনপতন নীরবতা। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার গাড়ি এসে থেমেছে আইভি টাওয়ারের সামনে। নেমে এলেন শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা। সোজা উপরে চলে গেলেন তারা। যেখানে একটু আগে আনা হয়েছে আইভি রহমানের লাশ। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা যাওয়ার পর ভারি হয়ে ওঠে বাতাস। কান্নার রোল সর্বত্র। এরপর শেখ হাসিনা যান জিল্লুর রহমানের রুমে। মিডিয়া কর্মীদের বিষয়টি তদারকি করছিলেন আসাদুজ্জামান নূর। তার কাছে সাংবাদিকদের দাবি শেখ হাসিনা আজ অন্তত কিছু বলুক। অপেক্ষার পর আসাদুজ্জামান নূর খবর নিয়ে এলেন এখনই শেখ হাসিনা কথা বলবেন মিডিয়া কর্মীদের সঙ্গে। জিল্লুর রহমানের রুমের ঠিক পশ্চিম পাশের রুমে প্রবেশ করলেন শেখ হাসিনা। একটি সোফায় গিয়ে বসলেন। এরপর সাংবাদিকরা তাকে ঘিরে দাঁড়ান। শেখ হাসিনার চোখে জল। কাঁদছেন তিনি। 

সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, কি বলবো আমি। কি বলার আছে। ওরা আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। আমার নেতারা, কর্মীরা মানব ঢাল তৈরি করে, কেউ জীবন দিয়ে আমাকে বাঁচিয়েছে। আমি দেশবাসীর কাছে এর বিচার চাই। কান্নায় বেশি কথা বলতে পারেননি শেখ হাসিনা। আইভি কনকর্ড টাওয়ারের ওইদিনের চিত্র আজো ভুলতে পারি না। জিল্লুর রহমান ও আইভি রহমানের বিয়েও এক ইতিহাস। ১৯৫৮ সালের ২৭শে জুন জেবুন নাহার আইভি’র বিয়ে হয় জিল্লুর রহমানের সঙ্গে। তাদের এ বিয়ের এক নম্বর সাক্ষী ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দ্বিতীয় সাক্ষী ছিলেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান। বিয়ের উকিল ছিলেন ক্যাপ্টেন মনসুর আলী। বঙ্গবন্ধুর  ছোট্ট গাড়িতে বসেই বর সেজে যান জিল্লুর রহমান।

সূত্র: মানবজমিন