• বুধবার, ২৩ আগস্ট ২০১৭, ৮ ভাদ্র ১৪২৪
  • ||
  • আর্কাইভ

সাত খুনে জড়িতদের ফাঁসি বহালের প্রত্যাশা নিহতদের স্বজনের

প্রকাশ:  ১৩ আগস্ট ২০১৭, ০৩:৪৩ | আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০১৭, ০৪:০৪
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রিন্ট

উচ্চ আদালতেও যেন নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলার আসামিরা সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পায়, সেই প্রত্যাশা করছেন নিহতদের স্বজনরা। তাদের প্রত্যাশা, আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে কেউ আর আগামীতে এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর সাহস পাবে না। সাত খুনের ঘটনা পরিকল্পিত ছিল মন্তব্য করে নিহতদের স্বজনরা দাবি করেন, মূল পরিকল্পনাকারী নূর হোসেনের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে র‌্যাব ওই ঘটনা ঘটিয়েছিল।

নারায়ণগঞ্জে চাঞ্চল্যকর সাত খুনের ঘটনায় দায়ের করা মামলার ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণ) ও আসামিদের আপিলের বিষয়ে হাইকোর্টের রায় ঘোষিত হবে আজ রোববার। বিচারপতি ভবানী প্রসাদসিংহ ও বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলামের বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করবেন। এর আগে গত ২৬ জুলাই মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শেষ হয়।

শনিবার দুপুরে সাত খুন মামলার বাদী ও নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন, নিম্ন আদালতে নূর হোসেন ও র‌্যাব-১১ এর চাকরিচ্যুত সিও লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ, মেজর আরিফ হোসেন, কমান্ডার এমএম রানাসহ ২৬ জনের ফাঁসির রায় হয়েছে। এই রায় উচ্চ আদালতেও বহাল থাকবে বলে প্রত্যাশা করছি। সাত খুনের ঘটনা ছিল পূর্বপরিকল্পিত। নূর হোসেনের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে র‌্যাব সাত জন মানুষকে খুন করে।আমরা স্বজনদের হারিয়ে দিশেহারা। এই মামলার রায়ের দিকে পুরো বিশ্ব তাকিয়ে আছে।

তিনি আরো বলেন, র‌্যাব রক্ষক হয়েও ভক্ষকের মতো আচরণ করেছে। তারা আমাদের নিরাপত্তা দেবে, কিন্তু তারা আমার স্বামীসহ সাত জনকে অপহরণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। কেবল ওই সাত জন মানুষকেই হত্যা করা হয়নি; সাতটি পরিবারকেই শেষ করে দেওয়া হয়েছে।

নিহত আইনজীবী চন্দন সরকারের গাড়িচালক ইব্রাহিমের বাবা আব্দুল ওয়াহাব মিয়া বলেন, আমরা গরিব মানুষ। অভাব অনটনের সংসারে আমার ছেলের বউ-নাতনিরা মানবেতর জীবন যাপন করছে। আমরা চাই, খুনিদের ফাঁসি হোক। এরপর দ্রুত রায় কার্যকর করা হোক।

নিহত মনিরুজ্জামান স্বপনের স্ত্রী সামসুন নাহার নুপুর বলেন, নৃশংস ওই হত্যাকাণ্ডের মামলার রায়ের দিকে পুরো দেশ তাকিয়ে আছে। আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি করতে কেউ সাহস পাবে না।

নুপুর আরো বলেন, আমার স্বামীর তো কোনও দোষ ছিল না। সে নিরাপরাধ ছিল। তাকেসহ সাত জন মানুষকে অপহরণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হলো। এমনভাবে তাকে হত্যা করা হয়ছিল, লাশটা ধরে কাঁদতে পর্যন্ত পারিনি। নূর হোসেনের টাকায় প্রভাবিত হয়ে র‌্যাব এই হত্যাকাণ্ড ঘটালো। আমাদের সাতটি পরিবার তছনছ হয়ে গেল। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে আজ আমি মানবেতর জীবনযাপন করছি। আমার মেয়ে তার বাবাকে দেখতে পারলো না। মেয়েটা বাবার ছবি ধরে শুধু কাঁদে। আমার জীবনটা না হয় এভাবেই পার করে দিলাম, কিন্তু মেয়ের জীবনটার কী হবে? নূর হোসেন ও র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ জড়িতদের ফাঁসি বহাল রাখার দাবি জানান তিনি। নিহত স্বপনের ছোটভাই রিপন বলেন, ভাই হারিয়েছি। আমরা চাই, খুনিদের ফাঁসি হোক।

নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান বলেন, ৭ খুনের মামলায় আমরা বিচারিক আদালতের মতো উচ্চ আদালতেও আসামিদের ফাঁসি চাই। পাশাপাশি রায় দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানাই।

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্যানেল মেয়র ও কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম এবং আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাত জনকে দিনে দুপুরে রাস্তা থেকে অপহরণ করা হয়। এর তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদী থেকে তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে নারায়ণগঞ্জবাসী। তারা হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে আন্দোলনে নামে এবং কয়েক দফা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে। সারা দেশে আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তুতে পরিণত হয় ঘটনাটি। সেই সময়ও নিহতদের পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে অভিযোগ ওঠে, নূর হোসেনের পরিকল্পনায় মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে র‌্যাবের তিন কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এমএম রানা, মেজর আরিফ এ হত্যাকাণ্ড ঘটান। 

পরে হাইকোর্টের নির্দেশে র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, একে একে ২৩ আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতাররা হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়।

ওই সময় ক্ষুব্ধ নারায়ণগঞ্জবাসী ও আইনজীবীদের আন্দোলনের মুখে তৎকালীন ডিসি-এসপিসহ দুই শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়। এই মামলায় নূর হোসেন ও র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ আসামিকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে মামলার তদন্তকারী সংস্থা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মাত্র আড়াই বছরের মধ্যে চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলায় চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি জেলা ও দায়রা জজ আদালত নূর হোসেন ও র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দেন। নিহতদের পরিবারের প্রত্যাশা,  উচ্চ আদালতেও এ রায় বহাল থাকবে।